ইসলামে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব কতটুকু? কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংক্ষিপ্ত আলোচনা
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ইসলামে 'ইলম' বা জ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে ইলমের উপকারিতা ও গুরুত্ব নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. ইলমের গুরুত্ব: কুরআনের আলোকে
ইসলামের প্রথম নির্দেশই ছিল জ্ঞান অর্জন সংক্রান্ত। আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি সর্বপ্রথম যে শব্দটি নাজিল করেছিলেন, তা হলো 'ইকরা' (পড়ুন)। কারণ,পড়া ছাড়া অনুসরণীয় হওয়া যায় না। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু সব উম্মতের অনুসরণীয় হবেন তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে সর্বপ্রথম নাযিলকৃত নির্দেশনা ছিল ইকরা তথা পড়ুন। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা নবীজিকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পদের পরিবর্তে জ্ঞান বৃদ্ধির দুয়া করতে শিখিয়েছেন এই বলে-: وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا অর্থ: "এবং বলুন, হে আমার পালনকর্তা! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।" (সূরা ত্বহা: ১১৪) এছাড়াও ইলমের গুরুত্ব যে কত অসীম তার কিঞ্চিত নীচে উল্লেখ করা হলো।
এক. মর্যাদা বৃদ্ধি: আল্লাহ তাআলা জ্ঞানীদের মর্যাদা অন্যান্যদের তুলনায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। যেমন কুরআনে এরশাদ হয়েছে:
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ ۚ
"তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।"
দুই. সঠিক অনুধাবন: সৃষ্টিজগত ও স্রষ্টাকে চেনার মূল চাবিকাঠি হলো ইলম বা জ্ঞান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ۗ
"বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?" (সূরা যুমার: ৯)
তিন. আল্লাহর ভয় অর্জন: প্রকৃত জ্ঞানই মানুষকে আল্লাহর প্রতি ভয় ও অনুগত করে তোলে।
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে।" (সূরা ফাতির: ২৮)
সুতরাং বুঝা গেল, ইলম অর্জন করার দ্বারা মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, হক ও বাতিল চেনা যায় এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি ভয়-শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভালোবাসা ও আনুগত্য অর্জন হয়।
২. ইলমের গুরুত্ব: সুন্নাহর আলোকে
রাসূলুল্লাহ (সা.) জ্ঞানার্জনকে প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক করেছেন। যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন : طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ "জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ।" (ইবনে মাজাহ)
সুতরাং, ইলম অর্জন করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি ফরয ও মৌলিক দায়িত্ব।
এমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন: مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ অর্থাৎ "যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।" (সহীহ মুসলিম) সুতরাং এটাও স্পষ্ঠ হলো যে,জ্ঞান অর্জনের পথই মূলত জান্নাতের পথ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন: خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ যার অর্থ,"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।" (সহীহ বুখারী) এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, জ্ঞান চর্চার মাধ্যমেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা যায়।
৩. ইলম অর্জনের বিশেষ উপকারিতা
এক. সঠিক ও ভুলের পার্থক্য লাভ: জ্ঞান মানুষকে হক (সত্য) ও বাতিল (মিথ্যা)-এর মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা দেয়। এটি ছাড়া ঈমান-আকীদা ও ইবাদত সঠিকভাবে সম্পন্ন করা যায়না।
দুই. সদকায়ে জারিয়া: ইলম এমন এক সম্পদ যা মৃত্যুর পরেও সওয়াব জারি থাকে। যদি কেউ দ্বীনি ইলম বা জ্ঞান অর্জন করে এবং তা অন্যকে শিখিয়ে যায়, তবে সেই শিক্ষা যতক্ষণ পৃথিবীতে কার্যকর থাকবে, ততক্ষণ তার আমলনামায় সওয়াব যোগ হতেই থাকবে।সুবহানাল্লাহ।
তিন. নবীগণের ওয়ারিস বা উত্তরাধিকার: পার্থিব সম্পদেও রাজা-বাদশাহদের উত্তরাধিকারী হওয়া যায়, কিন্তু নবীগণের ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী হওয়া যায় শুধুমাত্র ইলমের মাধ্যমে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "ওলামাগণ নবীগণের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী।"
চার. দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি: সঠিক জ্ঞান মানুষকে দুনিয়ায় পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে আর আখিরাতে সফলতার সন্ধান দেয়।
৪. ইলম অর্জনের লক্ষ্য
কেবল তথ্য জানা আর সংগ্রহ করার নাম ইলম বা জ্ঞান নয়; বরং অর্জিত ইলম বা জ্ঞান অনুযায়ী আমল করাই হলো ইলমের মূল লক্ষ্য। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন ইলম থেকে পানাহ চাইতেন যা কোনো উপকারে আসে না। তাই ইলম হতে হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং মানবতার কল্যাণের জন্য।
মোটকথা, ইলম হলো এমন একটি নূর বা আলো, যা মানুষকে জাহালতের অন্ধকার থেকে দূর করে সঠিক পথে পরিচালিত করে। ইসলামে ইলমহীন ইবাদতের চেয়ে ইলমসহ সামান্য আমলকেও অনেক অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে ইলম অর্জন করার এবং সে অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url