ইসলামে সম্পদ ও আলেমদের জীবন: কুরআন, হাদিস ও সালাফদের আলোকে
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
ইসলামে সম্পদ ও আলেমদের জীবন: কুরআন, হাদিস ও সালাফদের আলোকে
আজকের সমাজে অনেকেই মনে করেন, দ্বীনি ইলমের সাথে সম্পদের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং আলেমদের জন্য দারিদ্র্যই উপযুক্ত। টাকা-পয়সা আর সম্পদের প্রতি তাদের কোনোরূপ সম্পর্ক থাকা যাবে না। কিন্তু কুরআন, হাদিস এবং সালাফদের জীবন বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
নিশ্চয়ই ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে সম্পদকে যেন আমরা অন্তরে স্থান না দিই, বরং হাতে রাখি। অর্থাৎ, সম্পদ যেন আমাদের চালিকাশক্তি না হয়, বরং আমরা যেন সম্পদের নিয়ন্ত্রক হই। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণের জন্য দোয়া করতে শিখিয়েছেন: رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً "হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন।" (সূরা বাকারা: ২০১) এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্পদ সম্পর্কে বলেছেন: نِعِمَّ الْمَالُ الصَّالِحُ لِلْمَرْءِ الصَّالِحِ "একজন সৎ ব্যক্তির জন্য সৎ (হালাল) সম্পদ কতই না চমৎকার!" (মুসনাদে আহমাদ) অন্য বর্ণনায় ইরশাদ রয়েছে:রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: مِنْ سَعَادَةِ الْمَرْءِ الْجَارُ الصَّالِحُ، وَالْمَرْكَبُ الْهَنِيءُ، وَالْمَسْكَنُ الْوَاسِعُ অর্থ: “মানুষের সৌভাগ্যের মধ্যে রয়েছে—১.নেক প্রতিবেশী, ২.আরামদায়ক বাহন এবং ৩.প্রশস্ত বাসস্থান।” [مسند أحمد: 15372، حديث حسن] এটি প্রমাণ করে, দুনিয়াবি সামান্য স্বাচ্ছন্দ্য ইসলাম বা শরীয়ত বিরোধী নয়।
সালাফদের মধ্যে ইমাম সুফিয়ান সাওরী (মৃত্যু ১৬১ হিজরি) (রহ.) বলেন:"এই যুগে (তারযুগে বলা এই কথা। তাহলে এইযুগের অবস্থা কোথায়! তা তো সকলের চোখেই প্রতিয়মান) সম্পদ হলো মুমিনের ঢাল। যদি এই দিনারগুলো (টাকা-পয়সা) না থাকত, তবে এই শাসকরা আমাদের দিয়ে জুতো মোছাত (আমাদের অপমান করত)।" (সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/২৪১) এ থেকে বোঝা যায়, সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে তা সম্মান ও স্বাধীনতা রক্ষার মাধ্যম হতে পারে।
আলেমদের বাস্তব জীবন
আসুন, এবার শুনি আলেমদের বাস্তব জীবন কেমন ছিল? অনেকে মনে করেন, আলেমদের দারিদ্র্য থাকাই তাদের আদর্শ। অথচ বাস্তবতা হলো—সাহাবা, তাবেঈন ও পরবর্তী যুগের বহু আলেম স্বচ্ছল জীবনযাপন করেছেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ইমাম আহমদ (রহ.) সম্পর্কে বলেন : أحمد إمام في ثمان خصال: إمام في الحديث، إمام في الفقه، إمام في اللغة، إمام في القرآن، إمام في الفقر، إمام في الزهد، إمام في الورع، إمام في السنة." অর্থ: "আহমদ (ইবনে হাম্বল) আটটি বিষয়ে ইমাম (নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব): ১. তিনি হাদিসের ইমাম, ২. তিনি ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) এর ইমাম, ৩. তিনি ভাষা (আরবি সাহিত্য ও ব্যাকরণ) এর ইমাম, ৪. তিনি কুরআনের (এর জ্ঞান ও হিফজ) ইমাম, ৫. তিনি ফাকর (অভাব বা অভাবগ্রস্ত অবস্থায় ধৈর্য ধারণের) ইমাম, ৬. তিনি যুহদের ইমাম, ৭. তিনি ওয়ারা (সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকার) ইমাম, ৮. তিনি সুন্নাহর (সুন্নাহর অনুসরণ ও সংরক্ষণের) ইমাম।" [طبقات الحنابلة، 1/5] উল্লেখ্য, এখানে 'যুহদ' মানে দারিদ্র্য নয়। যুহদ হলো—হাতে সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অন্তরে তার প্রতি মোহ না থাকা।
ইতিহাসে এমন অনেক আলেম ও বুজুর্গ ছিলেন যারা আর্থিকভাবে অত্যন্ত স্বচ্ছল ছিলেন এবং সেই সম্পদকে দ্বীনের প্রয়োজনে অকাতরে ব্যয় করেছেন: তার কিঞ্চিৎ উদাহরণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
হযরত উসমান (রা.) : যাকে 'গনী' বা অত্যন্ত সম্পদশালী বলা হতো। তিনি নিজের সম্পদ দিয়ে ইসলামের কঠিন সময়ে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) : তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। তার সিল্কের কাপড়ের ব্যবসা ছিল এবং তিনি তার সম্পদের একটি বড় অংশ ছাত্র ও অভাবী আলেমদের পেছনে ব্যয় করতেন।
ইমাম লাইস বিন সাদ (রহ.) : তিনি সে সময়ের অনেক বড় আলেম ছিলেন। তার বার্ষিক আয় ছিল বিপুল, কিন্তু তিনি এত বেশি দান করতেন যে তার নিজের ওপর কখনও জাকাত ফরজ হতো না।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে : فَاجْتَبَى ثَمَرَتَهُ بِأَنْ وُلِّيَ الْقَضَاءَ... وَتُوُفِّيَ وَلَهُ سَبْعُمِائَةُ رِكَابٍ অর্থ: তিনি বিচারপতির পদে অধিষ্ঠিত হন এবং মৃত্যুকালে তার কাছে বিপুল সম্পদ ছিল। [شذرات الذهب، 1/294] এটি থেকে বুঝা যায়, ইলম অর্জন ও সম্মানজনক জীবন—দুটো একসাথেই সম্ভব।
স্বাভাবিকভাবে আলেমদের আর্থিক স্বচ্ছলতা অনেক বেশি প্রয়োজন । কারণ:
-
মানসিক প্রশান্তি: জীবিকার দুশ্চিন্তা না থাকলে একজন আলেম নিবিষ্ট মনে ইলম চর্চা ও গবেষণায় সময় দিতে পারেন। নচেৎ কোনভাবেই দ্বীন আর ইলমের উপর দৃঢ় থাকা তার জন্য সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বরং অসচ্ছলতা আর অভাবই একসময় তার জন্য ফিতনা আর কুফরির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুফুরির পাশাপাশি অভাবে পড়া থেকে পানাহ চাইতেন এই বলে- আল্ল-হুমমা ইননিই আউ‘যুবিকা মিনাল কুফরি ওয়াল ফাকরি..
-
ব্যক্তিত্বের মর্যাদা: অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হলে হক কথা বলার সাহস ও স্বাধীনতা অটুট থাকে। অন্যথায় পরনির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। আর পরনির্ভরশীলতাই মানুষকে ছোটমন আর হিনমন্যতার সম্মুখীন করে।
-
দাওয়াতের প্রসার: সম্পদ থাকলে তা দিয়ে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো সহজ হয়।
উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে,
দুনিয়াকে মূল লক্ষ্য বানানো যাবে না। আবার দুনিয়া সম্পূর্ণ ত্যাগ করাও সঠিক হবে না। বরং এদুভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই ইসলামের শিক্ষা।
কারণ,ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যেখানে দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় রয়েছে। ইলম অর্জন করে, তা অনুযায়ী আমল করা এবং দুনিয়াকে সেই পথের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই একজন মুমিনের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং ইলম ও দুনিয়ার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।

ইকরাবই ডটকম এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url